রাজ্যের নাম পাল্টে ‘বাংলা’ করতে চেয়েছিল তৃণমূল সরকার। বিলও পাস করিয়েছিল বিধানসভায়। কিন্তু কেন্দ্রের অনুমোদন মেলেনি। তৃণমূলের চাওয়ায় যে তাদের আপত্তি আছে, ক্ষমতায় আসার আগে জানিয়ে দিয়েছিল বিজেপি। তারা রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ রাখার পক্ষপাতী। বাংলাতে তো বটেই, ইংরাজিতেই। বিধানসভার পরের অধিবেশনেই এই মর্মে বিল আসতে চলেছে, সোমবার জানিয়ে দিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
সোমবার এক সাংবাদিক বৈঠকে শমীক বলেছেন, ‘‘এখন থেকে আর কোনও ওয়েস্ট বেঙ্গল, কোনও বাংলা, কোনও পশ্চিমবাংলা নয়। এ বার থেকে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নাম হবে (রাজ্যের)।’’ এ বার ইংরাজিতেও রাজ্যের নাম ওয়েস্ট বেঙ্গলের পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ লেখা হবে, জানিয়েছেন তিনি। গত অগস্ট মাসে কেরল রাজ্যের নাম পাল্টে কেরলম করা হয়। রাজ্যসভায় সেই বিল নিয়ে আলোচনার সময় এ রাজ্যের নাম সব ভাষাতেই পশ্চিমবঙ্গ রাখার কথা বলেছিলেন তিনি। “আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসছি, তাদের নির্দিষ্ট একটা রাজনৈতিক অতীত আছে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের বদলে শুধু বাংলা করলে সে দিন যাঁরা শহিদ হয়েছিলেন, রক্তস্নান করেছিলেন, তাঁদের অবদান বিস্মৃত হয়ে যাব।’’ সংসদে বলেছিলেন শমীক। এ দিন তিনি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে এই নামের সম্পর্ক রয়েছে। তাই একমাত্র এই নামই যাতে থাকে, তার জন্য বিল আনা হচ্ছে আসন্ন অধিবেশনেই।’’ কোনও রাজ্যের নাম পরিবর্তন করতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ করতে হয়। সেই বিল আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শমীক।
প্রশাসনিক প্রয়োজনে রাজ্যের নাম বদলের চিন্তাভাবনা দীর্ঘদিনের। কারণ, সব রাজ্যের প্রতিনিধিদের নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈঠকে ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী রাজ্যগুলোর নাম ধরে ধরে বলার সুযোগ দেওয়া হয়। ওয়েস্ট বেঙ্গেলর ডাক আসে সবার শেষে। একে দীর্ঘ অপেক্ষা, তার উপর প্রথম দিকের বক্তারা বেশি সময় নিয়ে ফেলায় শেষের বক্তাদের নির্ধারিত সময় কমে যায়। ফলে রাজ্যের নাম বদলের কথা বাম আমলেই ভাবা হয়েছিল। ১৯৯৯-এর ২০ জুলাই বিধানসভায় প্রস্তাব এসেছিল, রাজ্যের নাম সব ভাষাতেই ‘পশ্চিমবঙ্গ’ করা হোক। কিন্তু আলোচনা করে ঠিক হয় যে, পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে ‘বাংলা’ নামটা ভাল। সহমতের ভিত্তিতে তৎকালীন শাসক বাম ও বিরোধী কংগ্রেস-তৃণমূলের তরফে প্রস্তাবের উপরে সংশোধনী আনা হয়। পরে সেই উদ্যোগ কোথাও থমকে যায়। ১৭ বছর পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় ইনিংয়ের শুরুতে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়তা বাড়ে।
২০১৬ সালের ২ অগস্ট রাজ্য মন্ত্রিসভায় যে প্রস্তাব পাশ হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, রাজ্যের নাম তিনটি ভাষায় হবে। বাংলা ভাষায় নাম হবে বাংলা, ইংরেজিতে বেঙ্গল এবং হিন্দিতে বঙ্গাল। তাতে আপত্তি জানায় বামেরা। তাদের আনা সংশোধনী ১৮৯-৩১ ভোটে খারিজ হয়ে যায়। তার পর বাম ও কংগ্রেস বিধায়কদের অনুপস্থিতিতে মূল প্রস্তাব পাশ করিয়ে কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়। কারণ, রাজ্যের নাম পরিবর্তনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় রাজ্যের কাছে। তারা জানায়, তিনটি নয়, একটাই নাম হতে হবে রাজ্যের।
সেই মতো ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই বিধানসভায় আবার একটি প্রস্তাব পাশ হয়। সেই নাম ছিল বাংলা। প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সাযুজ্যের কারণে এই নামে অনেকে আপত্তি জানালেও বিধানসভায় এ বার সর্বসম্মতিতেই গৃহীত হয় প্রস্তাব। পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহকে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অনুরোধ করেন মমতা। রাজনাথও বিবেচনার আশ্বাস দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।

Post a Comment